ঢাকা , বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ , ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতকোটি টাকার সম্পদ, প্রশ্নের মুখে গণপূর্তের আলমগীর

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৯-০৮-২০২৬ ০৪:১৪:০৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৯-০৮-২০২৬ ০৪:১৪:০৬ অপরাহ্ন
শতকোটি টাকার সম্পদ, প্রশ্নের মুখে গণপূর্তের আলমগীর


গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম পি অ্যান্ড ডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি, পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে কানাডায় বাড়ি কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ধানমন্ডির বাসিন্দা এলাহী নেওয়াজ খান গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগের অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটেও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মো. আলমগীর খানের ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাংলো ও খামারবাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করতে তার ও পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, আলমগীর খান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কানাডায় পাচার করেছেন। সেখানে তিনি বাড়ি কিনেছেন এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন—এমন তথ্য স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈধ ও অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রকৃত তথ্য আয়কর নথিতে গোপন করে কর ফাঁকির অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের ই/এম বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আলোচিত। আলমগীর খান ওই জোনে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ২০১৬-১৭ সালের একটি অডিট প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। অডিট প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উঠে এলেও পরবর্তীতে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অডিট নথি অনুযায়ী, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৬ ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ২০১৬ সালের জুন মাসে একজন ঠিকাদারকে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে তিনটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এসব কার্যাদেশের আওতায় ১৬ চ্যানেলের ডিডিআর, পিটিজেড ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, ডিসপ্লে মনিটর, ডে-নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনের কথা ছিল। পরবর্তীতে ১৪ ও ১৫ জুনের বিভিন্ন স্মারকের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে একই বছরের ২০ অক্টোবর অডিট বিভাগের কর্মকর্তারা জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে সিসি ক্যামেরাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, চূড়ান্ত বিল পরিশোধের পরও নির্ধারিত কাজ সম্পূর্ণ হয়নি এবং স্থাপিত কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। পর্যাপ্ত কারিগরি জনবল থাকার পরও যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে কাজে না আসার বিষয়টিও অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ই/এম বিভাগ-৮-এ মাত্র দুটি সরকারি গাড়ি কার্যকর অবস্থায় থাকলেও ৩১ জন চালকের বেতন-ভাতা বাবদ অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এ খাতে বছরে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে এসব চালকের অনেকের বাস্তব উপস্থিতি পাওয়া যায়নি এবং তাদের নিয়োগ কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর আরও দাবি, বিভাগের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় পর্যাপ্ত স্থায়ী কর্মী থাকার পরও দৈনিক মজুরি, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী জনবল দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে হিসাব শাখা ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অডিট প্রতিবেদনে আর্থিক অসংগতি, অযৌক্তিক ব্যয় এবং নথিপত্রের গরমিলের বিষয় উঠে এলেও এসব বিষয়ে কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অভিযোগকারীরা পুরো বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে অভিযোগপত্রের অনুলিপিসহ হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর কাছেও অভিযোগপত্র পাঠিয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়। তিনিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে অভিযোগপত্রে উত্থাপিত সম্পদ, অর্থ লেনদেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, অডিট আপত্তি ও জনবলসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, প্রকল্পের কার্যাদেশ ও বিল-ভাউচার এবং অডিট প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ